Monday, January 21, 2019

ছোটগল্প"অাত্মজ"। লিখেছেন কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার "ভোরের ডাক "পত্রিকার প্রতিনিধি মুকুট দাস মধু ।

... আত্মজ .....
¤¤¤¤¤ মুকুট দাস মধু


প্রতিকি ছবি 
  


গাড় নীল শাড়িতে কেমন দেখায় তা পরখ করে দেখছিলো নীপা।কালো সিল্কি পিঠে ছড়ানো ঘন চুলে হালকা সুগন্ধী স্প্রে করে সদ্য ফোঁটা বেলী ফুলের মালা ডান পাশের সিঁথিতে গেঁথে দিয়ে গোলাপি ঠোঁটে সোনালি জরির লিপলাইনার টানতে টানতে চোখ রাখলো ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় ।
নাহ্ ..কালো টিপে ভালো দেখাচ্ছেনা।কুমকুম লাল টিপ বসিয়ে দিলো ধবধবে ফর্সা ললাটে।লাল গোলাপ ও রজনীগন্ধার ষ্টিক দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে রেখে অপেক্ষা করছে শুভ্র'র জন্য ।

বিশেষ বিরিয়ানি এবং গোটা মুরগির কাবাব থেকে এখনও গরম ভাপ বেরুচ্ছে ।



সন্ধাতারা নিভে গেছে অনেক আগেই ।শুভ্র এখনও ঘরে ফিরেনি।কখনও এত দেরি করেনা শুভ্র।আজ নিপা শুভ্র'র প্রথম বিবাহবার্ষিকী ।একাকী ঘরের ভিতরে পায়চারি করছে নীপা আর অপেক্ষা করছে কলিংবেলটা কখন বাজবে ।ঘরের আলোগুলি জ্বেলে প্রহর গুনছে নীপা।ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগিয়ে চলছে।তার সাথে বাড়ছে নীপার হৃদস্পন্দন ।ড্রইংরুমে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে স্লো ভলিউম শুনছে প্রয়াত শিল্পী মান্নাদে'র গাওয়া 'তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন,সব ই তোমার অভিনয় .... সত্যি কোন কিছু নয়.....
টেলিভিশনের সাউন্ড অফ করে রিমোট টিপে টিপে আনমনে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে এক জায়গাতে চোখ আটকে গেলো নীপা'র।মাথাটা ঝিম করে শিরদাঁড়া চিনচিনিয়ে উঠলো।এক ঝটকায় ফ্ল্যাটের দড়জা লক করে নীচে বড় রাস্তার ধারে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটি অটো তে উঠে পরলো নীপা।


এক বছরের নানা স্মৃতি ভেসে উঠেছে চোখের সামনে ।শপিংমলের বৈদ্যুতিক সমস্যায় লিফটে আটকা পড়েছিলো দুজনে।নীপা আর শুভ্র। ঘন্টাদুয়েক ঐ ছোট্ট রুমেই ওদের পরিচয় ও ভালোবাসার প্রথম প্রহর।নীপাকে কখনও চোখের আড়াল করেনি শুভ্র। নীপাও নিজেকে উজাড় করে দিতো শুভ্র'র বাহুডোরে।শুভ্র'র সুঠাম হ্যান্ডসাম দেহ,সুন্দর বাচনভঙ্গি,ভালো চাকুরি সবকিছুই নীপার খুব ভালো লাগে।পৃথিবীটা নতুন করে দেখে নীপা।কখনও পার্কে, লেকেরধারে, থিয়েটারে, কাশবনে,পাহাড় ,নদী ,পূর্নিমার ভরা জোৎস্নায় খোলা ছাদে সর্বক্ষণ একে অন্যের সাথী ছিল ওরা।

সপ্তাহ খানেক আগেই বামহাতের অনামিকায় একটি সোনার রিং পরিয়ে দিয়ে নীপাকে প্রমোশনের খবরটা দেয় শুভ্র।নীপাও আবেগে আলিঙ্গন করে শুভ্রর ঠোঁটে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়েছিলো।আঙ্গুলের আংটির দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছে নীপা।

হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে রেজিস্ট্রার দেখে দোতলার অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে যায় নীপা।কর্তব্যরত ডাক্তার জানান .... গুরুতর এক্সিডেন্টে মেরুদন্ডে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে কোমায় চলে গেছে পেশেন্ট ।আইসিইউ,র বাইরে দাড়িয়ে গ্লাসের ভিতরে শুভ্রকে দেখতে পায় নীপা।নিথর দেহ।ডান কান বেয়ে রক্তের দাগ।

আকাশের সব তাঁরা নিভু নিভু করছে।ওয়েটিং রুমে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে নীপা।শুভ্রই ছিলো নীপার পৃথিবী ।একটু একটু করে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চাঁদ । রাত ভোর নির্ঘুম নীপাকে বিধ্বস্ত লাগছে ।কিছুক্ষণ আগেও চারিদিকে ছিল সুনশান নীরবতা ।একটি দুটি করে পাখিদের কলরব ক্রমশ বাড়ছে ।পূব আকাশে রক্তিম আভা।চোখ দুটো মেলে রাখতে পারছে না নীপা।

হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনে ছুটে যায় নীপা।অপরিচিত এক মহিলাকে হাপুস নয়নে আইসিইউর গ্লাসে দুহাতে চেপে কাঁদতে দেখে নীপা বেশ অবাক হল।কাছে গিয়ে মহিলার পিঠে হাত রাখতেই মহিলা নীপাকে জড়িয়ে বলতে লাগলো.......
আমার স্বামীকে বাঁচান....
আমার স্বামীকে বাঁচান ।।।।।।
হতভম্ব নীপার পায়ের তলার মাটি যেন কেঁপে উঠল।ঘটনার আকস্মিকতায় ও যেন কাঁদতেও ভুলে গেল।
এক মুহূর্তে শুভ্রর প্রতি ঘৃণায় মনটা কঠিন পাষাণ হয়ে উঠল।নিজের গর্ভের সন্তানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে ভাবল।একজন বিশ্বাসঘাতকের কোন চিহ্ন সে রাখবে না।কিছু পরেই মা হবার স্বপনে সে হাত রাখে আস্তে নিজের পেটের উপর।ভাবে যে আসছে তাঁর কোনও দোষ নেই।এক পা দু'পা করে হাসপাতালের করিডোর থেকে নীচের দিকে এগিয়ে যায় নীপা.....................
লেখক


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

2 comments: